রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

অনন্তের স্পর্শ

 প্রাচূর্যও শূন্যতার আরেক নাম৷

বাড়ি, গাড়ি, গহনা, সম্পদ কিংবা খ্যাতি
ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরে মানুষকে,
স্বপ্নগুলোকে করে তোলে দৃশ্যমান;
মনে হয়, এই তো সুখ, এই তো প্রাপ্তি।
তবু এক অদেখা ভার
নিঃশব্দে বসে থাকে বুকের ভেতর,
হাসির আড়ালে জমে ওঠে
অকথিত এক ক্লান্তি।
সব কিছু পেতে পেতে
মানুষ মাঝেমধ্যে থমকে যায়;
অতিরিক্ত আলো চোখে লাগে,
ঝলকানির ভেতর হারিয়ে যায় দিকনির্দেশ।
তখন সে থামার চেষ্টা করে,
নিজের ভেতর একটু তাকায়,
যেখানে কোনো অলংকার নেই,
শুধু একা আত্মা
তার সত্যের মুখোমুখি।
এখানে ভেসে আসে এক নীরব আহ্বান;
কোলাহল পেরিয়ে,
অভিমান ডিঙিয়ে,
সব প্রাপ্তির গর্ব ছাড়িয়ে,
ডেকে নেয় তাকে এক অচেনা শান্তির দিকে।
নামাজে পূর্ণতা;
যেখানে মাথা নত হলেই
অহংকার ভেঙে পড়ে মাটির মতো,
আর হৃদয় খুঁজে পায়
তার আসল ঠিকানা।
আল্লাহর ধ্যানে ডুবে গেলে,
সময়ের গতি দুনিয়ার হিসাবে থাকে না;
প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে গভীর,
চাওয়াগুলো ঝরে পড়ে নীরবে,
অস্থিরতা গলে যায় অদৃশ্য স্রোতে।
দুনিয়ার কয়েকটি মিনিট,
কিন্তু সেই ধ্যানের গভীরে
সময় তার অর্থ হারায়।
নামাজি ধীরে ধীরে
অন্য এক জগতে প্রবেশ করে,
যেখানে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং দরজা;
আর দরজার ওপারে
অসীম এক উপস্থিতি৷
আল্লাহ,
আল্লাহ,
আর আল্লাহ।
স্রষ্টা যখন হৃদয় প্রশান্ত করেন,
তখন সব তথ্য, সব প্রশ্ন, সব দ্বিধা
নীরব নদীর মতো হয়ে যায়;
বয়ে চলে, কিন্তু শব্দহীন,
গভীর, কিন্তু অশান্তিহীন।
মানুষ মাঝে মাঝে বুঝে
প্রাচুর্যের ভিড়ে সে ছিল একা,
আর এই নীরবতার ভেতরেই
সে খুঁজে পেয়েছে
তার চূড়ান্ত সঙ্গ,
তার সত্য,
তার শান্তি।


মুহূর্তের জাগরণ

 যখন আগুন ধরানোর কথা ছিল

আঙুলের ফাঁকে সিগারেট,
ঠিক তখনই মনে পড়ল—
ওজুর স্বচ্ছতা,
শ্বাসের ভেতর লুকানো এক নীরব ইবাদত৷
দুর্গন্ধের বদলে
আমি বেছে নিলাম নিঃশ্বাসের পবিত্রতা,
অস্থিরতার বদলে
একটু থেমে থাকার সাহস।
এই পৃথিবী
হয়তো খুব শান্তির জায়গা নয়,
এখানে প্রতিদিনই টানে নিচের দিকে কিছু না কিছু;
তবুও
আল্লাহর রহমত
একটা অদৃশ্য দড়ির মতো
টেনে তোলে ভেতরের মানুষটাকে।
সমুদ্রের ঢেউ যেমন
নিজের নিয়মে ফিরে আসে তীরে,
আকাশের তারা যেমন
অন্ধকার ভেদ করেও জ্বলে
ঠিক তেমনই
একটা নামাজের চিন্তা
ফিরিয়ে আনে আমাদের আমাদের ভেতরে।
নামাজের ডাকে সিগারেটটি ধরানো হলো না;
এটা কোনো বড় ত্যাগ না,
কিন্তু
এটাই হয়তো শুরু,
যেখানে বদ অভ্যাসগুলো
এক এক করে হেরে যায়
একটা ছোট, পবিত্র ভাবনার কাছে।


অজ্ঞাতভয়

ডুমুর ফলে লাল পিঁপড়া;

কৃষাণীর বোধে
যা কামড়ায়, তাই অশুভ;
যা ব্যথা দেয়, তা-ই বর্জ্য৷
বলেন, “কেটে ফেলো এ গাছ, এই ঝামেলা;
শান্তি মানে ফাঁকা আঙিনা।”
কৃষকের পুত্র, শিক্ষিত;
সে বইয়ে পেয়েছে অদৃশ্য পুষ্টির নাম,
অদেখা উপকারের মানে।
বলে, “মা,
যা চোখে খারাপ লাগে,
সবই কি অপ্রয়োজন?”
মা রাগেন,
যুক্তি তার অপমান লাগছে
নতুন জ্ঞান তার অভ্যাসে আঘাত হানছে।
সে ভাবে,
“এই তো কোনো মেয়ে,
ছেলের মাথাটা খেয়েছে;
নইলে এমন উল্টা কথা আসে কীভাবে!”
সংঘর্ষ,
চোখে দেখা বনাম মনে বোঝার;
অভ্যাস বনাম অনুসন্ধানের।
সমাজও ঠিক এমনই,
যা একটু কাঁটে, তাকেই বলে ‘জঞ্জাল’,
যা প্রশ্ন তোলে, তাকেই বলে ‘ভ্রষ্ট’,
আর যে বুঝাতে চায়
তার পেছনে খোঁজা হয়
কোনো অদৃশ্য প্ররোচনার ছায়া।
শেষ পর্যন্ত,
গাছটা কাটা পড়ে;
না পিঁপড়ার জন্য,
না ফলের দোষে,
বরং অজানাকে ভয় পাওয়ার অপরাধে।



অভাব-নন্দন

 বাজারের বড়ো মাছটা,

হাত বাড়িয়েও ছুঁতে পারলাম না;
চোখের সামনেই অন্য কেউ নিয়ে গেলো।
যাকে দুর্বল ভাবতাম,
সে আজ ভালো আছে সবকিছুর ভেতর।
একটু কষ্ট,
নিঃশব্দ এক হার মানা।
মনে হলো, সবাই এগিয়ে গেলো,
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একই জায়গায়।
তারপর সময় বয়ে গেলো,
আফসোসগুলোতেও ঘূণ ধরলো।
সব হারানো গুনতে গুনতে একসময় বুঝলাম,
জীবন মানে সব না-পাওয়াকে মেনে নেওয়ার
এক নীরব শিল্প।
কখনো কিছু পাই,
কখনো কিছু হাতছাড়া হয়;
কিন্তু তবুও জীবন থেমে থাকে না;
শুধু নতুনভাবে এগিয়ে চলে।
যা হার মনে হয়েছিল,
তা-ও একদিন শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়;
আর যা জয় মনে হয়েছিল,
তা-ও সময়ের কাছে বদলে যায় অর্থে।
এখন পর্যন্ত বুঝলাম,
আমি পুরোটা জিতিনি, পুরোটা হারিওনি;
আমি শুধু বেঁচে আছি,
আর শিখে চলেছি।



সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

অস্পষ্টতার আকাঙ্ক্ষা

 কিছু মানুষের শত্রু হওয়ার কথা ছিল

কিন্তু তারাই প্রিয় হয়ে যায় স্মৃতিচারণে,
সময় কি তবে শত্রুতার সংজ্ঞা বদলে দেয়?
নাকি আমরা ভুলে যাই যুদ্ধের কারণ,
মনে রাখি শুধু তাদের মুখের আলো?
কিছু মানুষ,
কিছু না করেও অনেক কিছু;
তারা উপস্থিতিরও বাইরে এক উপস্থিতি,
শব্দহীন থেকেও রেখে যায়
অসংখ্য বাক্যের ভার।
কিছু মানুষ নষ্ট, ভ্রষ্ট, কষ্ট;
কিন্তু আপনি তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না৷
কারণ হয়তো তার ভাঙনের মধ্যেই
আপনি নিজের কোনো ভাঙা অংশ খুঁজে পান।
পৃথিবীতে,
অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু কিছু জায়গায়
হঠাৎ কিছু মানুষের সাথে
কিছু কিছু আলাপ অতি প্রয়োজনীয় হয়;
কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না,
সময় যেন সব দরজার চাবি হাতে রেখেও
ইচ্ছেমতো খুলে না।
কিছু কিছু বিষয় অস্পষ্ট,
কিন্তু তার জন্যই কেউ কেউ ব্যাকুল;
অস্পষ্টতার ভেতরই জন্ম নেয় আকাঙ্ক্ষা,
অপূর্ণতার ভেতরই গভীরতা।
মানুষ, ব্যথা, মায়া আর অপূর্ণতার ভেতর দিয়ে
জীবন এক অদৃশ্য কবিতা হয়ে থাকে;
এখানে সব না-পাওয়া
শেষ পর্যন্ত
অদ্ভুত এক পাওয়া হয়ে যায়।

সাধনার অন্তর্ঘাত

 আমি সাধনার দিকে যাচ্ছিলাম

নিজেকে হালকা করে,
জীবন থেকে শব্দগুলো ঝরিয়ে।
ভাবছিলাম,
একদিন নিঃশব্দই হবে আমার শেষ পরিচয়।
কিন্তু
আপনি এসে দাঁড়ালেন ঠিক মাঝপথে।
না, আপনি কোনো আলোর উৎস নন,
বরং এক ধরনের অন্ধকার;
যার ভেতরে ঢুকলে
নিজেকেই হারাতে হয়।
আপনার ভেতরে শৃঙ্খলা নেই,
নেই সৌন্দর্যের কোনো সুশৃঙ্খল ব্যাখ্যা;
তবুও কেন যেন
আমার সমস্ত অশান্ত চিন্তা
আপনার দিকেই স্থির হয়ে গেল।
সাধনা আমাকে শূন্য হতে শেখাচ্ছিল,
আর আপনি
আমাকে পূর্ণ করে তুললেন বিশৃঙ্খলায়।
এ কেমন বিপরীত আকর্ষণ!
আপনি এক ভাঙা কালো পাতিল,
যেখানে আগুনের ভাষা কাঁদে;
আর আমি
সেই আগুনেই আমার সাধনাকে
বারবার গলিয়ে দেখি।
হয়তো এটাই সত্য
সব সাধনা শেষ পর্যন্ত
কোনো না কোনো ভাঙনের কাছেই মাথা নত করে।

অনন্তের স্পর্শ

  প্রাচূর্যও শূন্যতার আরেক নাম৷ বাড়ি, গাড়ি, গহনা, সম্পদ কিংবা খ্যাতি ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরে মানুষকে, স্বপ্নগুলোকে করে তোলে দৃশ্যমান; মনে হয়, এই...